ফড়িং [Bangla Story]

       শিশুদের মজার মজার খেলাগুলো তাদের জীবনে সম্পদ হয়ে থাকে। ছায়া যেমন কখনও পিছু ছাড়ে না, ঠিক তেমনি শিশুকালের আনন্দময় খেলাগুলো তাদের সমগ্র জীবনে হীরার চেয়েও মূল্যবান হয়ে রয়!

 

চারিদিকে এতো ফড়িং উড়ছে যে তাদেরকে ধরার লোভ সামলানোটাই কঠিন! রিহান এবং তার বন্ধুরা পাগলের মতন এদিক ওদিক ছোটাছুটি করে ফড়িং ধরার মহোৎসবে মেতেছে। যেন আজ ফড়িং ধরা দিবস!  

 

        এতো রঙিন এবং দৃষ্টিনন্দন ফড়িং দেখে চোখ ফেরানো যায় না। উড়ন্ত ফড়িং ধরতে যাওয়ার মতন বোকামি আর নেই! কারণ সেই অবস্থায় ফড়িং-কে ধরা অসম্ভব। ফড়িং ধরার সবচেয়ে মোক্ষম উপায় হচ্ছে যখন সেটা কোনও গাছের পাতায় বসে থাকবে। তখন চুপিসারে পেছন থেকে গিয়ে ফড়িং-এর লেজে ধরলেই হলো! ব্যাস! ফড়িং আর পালায় কোথায়?

 

        কিন্তু এই পদ্ধতিতে ফড়িং ধরায় সামান্য একটু অসুবিধা আছে; অন্যদের তেমন কোনও সমস্যা না হলেও রিহানের হয়। মানে হচ্ছে এই যে যখনই রিহান ফড়িং-এর লেজ ধরে, তখনই ফড়িংটি নিচ দিয়ে মাথা ঘুড়িয়ে এনে রিহানের আঙুলে কামড় বসিয়ে দেয়! যদিও ফড়িং-এর মুখ খুবই ছোট এবং এর কামড়ও তেমন মারাত্মক কিছু নয় কিন্তু তারপরও কেন জানি রিহান বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই কামড় খাওয়ার সাথে সাথেই ফড়িংটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। রিহানের এই ভয়ের কারণেই তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে। আইমানতো তাকে একটি টাইটেলও দিয়ে দিয়েছে- ভীতুর ডিম!

 

        অন্যরা যেখানে ফটাফট ফড়িং ধরতে থাকে, রিহান সেখানে মাত্র দুয়েকটা ধরে। যে কারণে ফড়িং ধরার প্রতিযোগিতায় রিহান সর্বদা গোল্লা পায়! ফড়িং ধরে অহেতুক মেরে ফেলাই এইসব দুরন্ত ছেলেদের উদ্দেশ্য নয়। তারা ফড়িং ধরে সেই ফড়িং-এর লেজে চিকন সুতো বেধে সুতোর একপ্রান্ত হাতে ধরে রাখে আর ফড়িংটিকে ছেড়ে দেয়। ঐ অবস্থায় ফড়িংটি প্রাণপণ চেষ্টা করে আকাশের দিকে উড়ে যেতে চাইলেও বারবার ব্যর্থ হয় কারণ সেটির লেজ যে বাধা!

 

        শিশুদের অনেক মজার খেলার মধ্যে এটিও একটি। মাঝে মাঝে ফড়িং উড়তে উড়তে সুতোর টান তীব্র হলে সেটির লেজ ছিঁড়ে যায়! এর কারণ হচ্ছে এই যে ফড়িং-এর দেহ খুবই হালকা অনেকটা প্রজাপতির মতন।

 

        অনেক সময় সামান্য অসতর্কতায় রিহানের হাত থেকে সেই সুতো খসে পড়লে ফড়িং উড়ে নাগালের বাইরে চলে যায়। কিন্তু সে খুব দ্রুত দৌড়ে সেই সুতোটি আবারও ধরে ফেলে। তাই ফড়িং সহজে পালাতে পারে না। এটা অনেকটা সুতো ছিঁড়ে উড়ে যাওয়া ঘুড়ির মতন! যেটির পেছনে দামাল ছেলেরা পাগলের মতন ছোটে; যে আগে ঘুড়িটি ধরতে পারবে, সেই হবে সেটির মালিক! তাই এমন প্রতিযোগিতা!

 

        যাইহোক, ইতোমধ্যে রিহান ফড়িং ধরার আরও সহজ এবং অত্যধিক কার্যকর উপায় বের করেছে! কারণ সাধারণ নিয়মে ফড়িং ধরে আর সে ফড়িং-এর কামড় খেতে চায় না। উপায়টি হচ্ছে এই যে একটি ছোট্ট লাঠির ডগায় সামান্য আঠা লাগিয়ে দূর থেকে সেই লাঠিটি ফড়িং-এর লেজে লাগালেই ফড়িং-টি খুব সহজেই আঠায় লেগে যাবে! শত চেষ্টা করেও তখন সেটি নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না।

 

        রিহান তার নব উদ্ভাবিত পন্থায় ফড়িং ধরে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে! এখন ফড়িং ধরার প্রতিযোগিতায় কেউ তার ধারে কাছেও থাকে না! সেই অনন্য বিজয়ী! এখন আর কেউ তাকে ভুলেও ভীতুর ডিম! বলে ডাকে না। এখন সবাই তাকে রাজ ফড়িং বলে ডাকে! রাজ ফড়িং ডাকটি শুনলে রিহানের নিজেকে ফড়িং ফড়িং মনে হয়! নামটি তার তেমন একটা পছন্দ না হলেও মনে মনে সে গর্ববোধ করে।

 

একদিন রিহানের প্রচণ্ড জ্বর আসে। যথারীতি তার বন্ধুরা তাকে ডাকতে আসে একসাথে ফড়িং ধরতে যাবে বলে। রিহানের মা নীলা রিহানের অসুস্থতার কথা জানালে তারা তার সাথে কথা বলতে বাসায় প্রবেশ করে। সবাই রিহানের কক্ষে গিয়ে দাঁড়ায়। বন্ধুদের মধ্যে তাহসান নামে একজন বলে,

 

- কি রে দোস্ত! ফড়িং ধরতে যাবি না?


- আমার তো ইচ্ছে আছে দোস্ত, কিন্তু কি করবো বল, মা তো যেতে দিতে চায় না! বলে, গায়ে এতো জ্বর নিয়ে কোথাও যাওয়া টাওয়া নেই!


- ঠিক আছে, সমস্যা নেই। তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ হ, তারপর আবারও আমরা একসাথে ফড়িং ধরতে যাবো, ঠিক আছে?


- মানে? আমি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তোরা কি ফড়িং ধরতে যাবি না?


- না।


- এটা কোনও কথা হলো? আমার জন্য তোরা কেন নিজেদের আনন্দটাকে বিসর্জন দিবি?


- চুপ করতো! বয়স্কদের মতন বড় বড় কথা বলতে হবে না! এখন যাই, ভালো থাকিস। পড়ে দেখা হবে!


- তোরা এসেছিস বলে আমি খুব খুশী হয়েছি। তোরাও ভালো থাকিস।

 

        রাতে রিহানের জ্বর আরও তীব্র হয়; যেন সারা শরীর জ্বলন্ত কয়লার উপরে রাখা! রিহান আধো ঘুম আধো জাগ্রত অবস্থায় একটি অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। স্বপ্নে একটি দৈত্যের মতন আকৃতির ফড়িং রিহানের পায়ে বিশাল দড়ি বেধে দড়ির অন্য প্রান্ত নিজের হাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে। রিহান প্রাণপণে চেষ্টা করেও নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না! সে দৌড়াচ্ছে তো দৌড়াচ্ছেই। কিন্তু তার সকল চেষ্টাই বৃথা যায়। অনেকক্ষণ একটানা চেষ্টার ফলে সে প্রচণ্ড শব্দ করে হাঁপাতে থাকে। হাঁপাতে হাঁপাতেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। 

 

        স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে। কিন্তু রিহান আর সেই স্বপ্নের রাজ্য থেকে ফিরে আসে না! অর্থাৎ সে মারা যায়। রিহান আর কক্ষনো ফড়িং ধরতে পারবে না! 

View kingofwords's Full Portfolio
tags: